www.ullas24.com

Breaking

18 June, 2021

"পিচ্চি" সানজিদা শাহীনুর

 আমার প্রাইভেট সময় একদম দুপুরে, খুবই বিরক্ত লাগে দুপুরে প্রাইভেট যেতে তবুও কখনো প্রাইভেট মিস দেই না আমি। নিয়ম করে রোজ সময়মত প্রাইভেটের সামনে হাজির হওযা চায় আমার। সেদিনও প্রাইভেট গেছিলাম খুব মন খারাপ নিয়ে। মন খারাপের কারণ হলো আমি ল্যাপটপ চেয়েছি কিন্তু এখন আমাকে ল্যাপটপ নিয়ে দিবে না। তাই রাগ টাগ করে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। প্রাইভেট শেষ করে বান্ধবীদের সাথে হেটেহেটে রাস্তার দিকে যাচ্ছিলাম। এমন সময় এক পিচ্চি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল--

"বাদাম নিবেন?"
পিচ্চি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখি, ছেলেটা প্যান্ট পরে আছে আর গায়ে তেমন কিছুই নেই, পায়েও কিছু নেই। পিচ্চিটা শ্যামবরণ আর গোলগাল মুখ। এমন পিচ্চিরা দেখতে হয় টোকাইয়ের মত। কিন্তু এই পিচ্চিটা দেখতে অনেক কিউট কিন্তু একটু অগোছালো। হাতে সবুজ রঙের একটি বড় পলি। সেটার ভেতর থেকে পিচ্চির ময়লা একটি শার্ট আর বাদামের একটি ঠোস উকি দিচ্ছে। হয়ত অনেকক্ষণ ধরে বাদাম বিক্রি করছিল যার ফলে তার পলিতে বাদামের ঠোসের পরিমাণ মাত্র একটি।
আমি তখন পিচ্চিটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, "পিচ্চিটা চাইলে বাদাম বিক্রি না করে এমনি টাকা চাইতে পারতো।" আমি যখন চিন্তাই মগ্ন তখন আমার পাশের এলিয়েন গুলো (বান্ধবীগুলো) পিচ্চিকে নানা রকম প্রশ্ন করতে শুরু করে। এতো কথার ভীড়ে তারা কেউ বাদাম নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল না। কেউ একজন বাদামের দামও জানতে চাইল না। তাদের প্রশ্নের পিঠেই আমি পিচ্চিটার দিকে ঝুকে বাদামের দাম জানতে চাইলাম। সে দাম বললে আমি কোন কথা ছাড়াই বাদাম কিনে হাতে ধরে সোজা হয়ে দাড়ালাম। সে বাদামের দামটা পলির ভেতর ঢুকিয়ে রাখল। আর এদিকে এলিয়েন গুলো তাদের প্রশ্নপর্ব চালিয়েই যাচ্ছিল।





"তোমার নাম কি?"
"তোমার বাসা কোথায়?"
"তোমার বাসায় কে কে আছে?"
"ভাইবোনদের মধ্যে তুমি ছোট নাকি বড়?"
"তুমি পড়াশোনা করো নাকি বাদাম বিক্রি করো?"
"তুমি শুধু বাদাম বিক্রি করো নাকি অন্য কিছুও বিক্রি করো?" ইত্যাদি ইত্যাদি আরোও কত রকম প্রশ্ন।
পিচ্চির কথা জানি না তবে এই গুলো প্রশ্ন শুনে আমি চরম বিরক্ত। তবে পিচ্চিটা মাথা নিচু করেই সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। তার মধ্যে কোন রাগ বা বিরক্তি ভাব নেই। যেটা আমাকে খুব অবাক করছিল। তাদের প্রশ্ন শেষ হলে আমি বললাম--
"পিচ্চি তুমি গায়ে শার্টটা পরে নাও।"
আমার কথা সে বুঝল কিনা জানি না। আমার বান্ধবীগুলো সামনে হাটতে শুরু করেছে। তারা একটু সামনে এগিয়ে যেতেই আমি হাটু ভাজ করে পিচ্চির সামনে বসে ওর হাতে ধরে রাখক পলির ভেতর বাদামের ঠোসটা আস্তে করে রেখে তার চোখের দিকে তাকালাম। সে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি মুচকি হেসে আস্তে করে তার দিকে বললাম--
"এটা আমি তোমাকে দিলাম। তুমি যদি বাদাম খাও তবে এটা খেয়ে নিবা। আর যদি না খেতে চাও তবে এটা অন্যকারো কাছে বিক্রি করতে পারো। তবে তুমি এটা খাইলে আমি খুশি হবো।"
কথাটা বলে আমি পিচ্চিকে ক্রস করে সামনে বান্ধবীদের সাথে মিলিত হলাম। পেছন ফিরে না তাকিয়েও বুঝতে পারছিরাম পিচ্চিটা অবাক হয়ে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। বেশ কিছুদূর আসতে পেছন থেকে ওই পিচ্চিটা "আপু" বলে ডেকে উঠল। আমরা পেছন ফিরে তাকালাম। পিচ্চিটা গায়ে শার্ট পড়েছে। পিচ্চিটার হাতে কিছু ফুল। সে মৃদু ভাসে হেটে আমার সামনে দাড়িয়ে ফুল গুলো আমার দিকে এগিয়ে দিলো। আমি ফুল হাতে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম৷ আমাকে ফুল দেওয়া দেখে বান্ধবী গুলো তাকে বলল--
"আমাদের ফুল কই?"
পিচ্চিটার অন্য হাতে ধরা ছোট ছোট ফুল গুলো তাদের কে দিলো। আমাকে বড় সুন্দর ফুল দিয়েছে বলে তাদের অভিমান করে মুখ গোমরা চেহরা দেখে পিচ্চিটা হেসে উঠেছিল। পড়ন্ত বিকেলে এমন নিষ্পাপ পথশিশুর মুখের হাসি যেন প্রকৃতির সৌন্দর্য আরোও বৃদ্ধি করে দিয়েছে। হাতের ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি অনুভর করছিলাম আমার মন খারাপ ভালো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল আমি সব পেয়ে গেছি, আর কিছু পাওয়ার নাই আমার।
কিছু মানুষের মুচকি হাসি হৃদয় ছুয়ে যায়। হাসিটাও যে হয় পবিত্রতায় মাখা। আমরা সেখানে ভালোবাসা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে যায় যেখানে আমাদের জন্য ভালোবাসা থাকে না। আর যেখানে ভালোবাসা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে সেখানে আর খুঁজে উঠা হয় না। বিষয়টা এমন যে, দিনের আকাশে তারার খোঁজ করা।
-
-
-
"পিচ্চি"
সানজিদা শাহীনুর

No comments:

Post a Comment

Pages