www.ullas24.com

Breaking

18 June, 2021

জুঁইফুল সানজিদা শাহীনুর

 হাসনাহেনার মিষ্টি সুভাস আর পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙ্গা মানে সারাদিন ফাটাফাটি টাইপের ভালো কাটা। আফরা ঘুম থেকে উঠার দু'আ পড়ে বালিসের পাশ থেকে ফোন হাতে নিয়ে অন করে সময় দেখে নিলো। সকাল ৭ঃ২০ বাজে। ফজরের নামাজ পড়ে তেলাওয়াত শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়েছে বুঝতেই পারে নাই। সময় দেখার পর হটাৎ করেই লাফিয়ে উঠল বিছানা থেকে। ৮ঃ৩০ এ তার একটা টিউশনি পড়ানো আছে। ইশ! একদম মনে নেই।



দ্রুত বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে ফটাফট রেডি হয়ে রুম থেকে বের হলো আফরা। রুম থেকে বের হতে দেখেই সাহারা বেগম টেবিল থেকে বলে উঠলেন
--না খেয়ে কোথায় যাচ্ছ আফরা?
--আম্মু, টিউশনি পড়ানো আছে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
--আমি তো সেটা শুনব না আফরা, দ্রুত টেবিলে বসো, খেয়ে তারপর বের হবে বাসা থেকে।
আফরা দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিলো, ৭ঃ৫৮ টা বাজে। ৫মিনিট সময় নিয়ে হালকা কিছু খেয়ে নেযা যাবে। নয়লে যে আম্মু চিল্লাতে শুরু করবে সেটা আফরার ভালো করে জানা। কিছু না বলেই টেবিলে বসে অল্প কিছু খেয়ে বাসা থেকে বের হলো।
বিরক্ত হয়ে হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো একবার, রাস্তায় এতো এতো গাড়ি অথচ ৮ মিনিট ধরে রাস্তায় দাড়িয়ে থেকেও কোন ফাঁকা রিকশা পাওযা যাচ্ছে না। এটা কোন কথা হলো? কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফাঁকা রিকশা পেয়ে তাড়াহুড়ো করে উঠে বসলো। ১৮ মিনিটের মাথায় জেবার বাসার সামনে এসে রিকশা থামলো। ভাড়া মিটিয়ে বাসার কলিংবেল একবার চেপে হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিলো আফরা। খুব বেশি দেরি হয় নাই তাহলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবারও কলিঙবেল বাজাতেই জবা এসে দরজা খুলে দিল।
--আসসালামু আলাইকুম আপু
--ওয়ালাইকুমুসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কেমন আছো জবাফুল?
--আলহামদুলিল্লাহ ভালো আপু। আপনি কেমন আছেন?
--আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
জবার নির্দিষ্ট রুমের টেবিলে বসে আফরা বই বের করে পড়তে বলে জেবাকে। জেবা এবার এসএসসি দিবে, খুব ভালো ছাত্রী না হলেও মোটামোটি ভালো ছাত্রী, তবে মেয়েটা দেখতে যেমন মিষ্টি তার আচরণ ও তেমন মিষ্টি। জেবা খুব মনোযোগ দিয়ে অংক কশতে ব্যস্ত। পাশের রুম থেকে জেবার আম্মুর কথা শোনা যাচ্ছে। বিয়ে না হওয়া নিয়ে কিছু একটা বলছে যেটা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে না। আফরা সেদিকে কান না দিয়ে জেবার হোমওয়ার্ক দেখায় মনোযোগ দিলো। বেশ কিছুক্ষণ পর আবারও কথা শোনা যাচ্ছে তবে এবার কথার সাথে কান্নার শব্দও শোনা যাচ্ছে। জেবার আম্মু চাপা স্বরে কান্না করছে, উনাকে উদ্দেশ্য করেই এক বয়স্ক মহিলার কণ্ঠে চাপা স্বরে ধমকানো কানে এসে লাগল
--এখন এভাবে কান্না করে লাভ কি? সময়ের কাজ সময়ে না করে এখন কান্না করে লাভ আছে। তখন কত করে বললাম, জুঁই তো বড় হয়েছে এবার নাহয় বিয়েটা দিয়ে দাও। তুমি দুলাভাই বললা, মেয়ে তো সবে অনার্স করছে, এখনি বিয়ে দিয়ে কি করবো। মাস্টার্স টা শেষ করুক। তারপর নাহয় বিয়ে নিয়ে ভাবা যাবে। তখন কতশত ভালো জায়গা থেকে বিয়ে এসেছিল, বিয়ের পরও পড়াইতে চেয়েছিল। তখন কত করে বললাম, বিয়ে করিয়ে রাখো পরে নাহয় মেয়েকে নিয়ে যাবে, তাতেও তোমরা রাজি হলে না। তোমাদের এক কথা মেয়ের পড়াশোনা আগে শেষ হোক এরপর বিয়ে।
মেয়ের পড়াশোনা শেষ হলো ১ বছর হলো, মাস্টার্স শেষ করে বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজতে গিয়ে কি হলো? পাত্রর এক চাওয়া অনার্স পড়ুযা মেয়ে নিবে। মেযে দেখতে এসেও ঘুড়ে যায়। এদিকে মেয়ের বয়স বাড়ছে বই কমছে না। এতোদিন থেকে বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজা হচ্ছে তাও একটা গতি হচ্ছে না।
--তখন কি আর জানতাম এমনটা হবে। ভেবেছিলাম মেয়ে পড়াশোনা করছে, ভালো করে পড়াশোনা করুক। অনেকেরই তো পড়াশোনা শেষে বিয়ে হচ্ছে। শুধু শুধু বিয়ে দিয়ে পড়াশোনার ক্ষতি করে কি করবো।
কান্না করতে করতে কথা গুলো যেন বেধে আসছিল।
--সবার হলেই যে তোমার মেয়ের হবে এমন টা তো নয়। আচ্ছা যা হয়েছে হয়েছে। এখন তো আর অতীত পরিবর্তন করা যাবে না। কি আর করার।
এরপর আর কোন কথা কানে আসলো না, শুধু হিচকি তুলে কান্নার শব্দ পাওয়া গেল। হয়ত কথা বলার মত কোন কথা আর নেই।
--আপু.. আপু..
--হ্যা জবাফুল বল।
--অংক করা শেষ, এখন দেখবেন?
--হ্যা, দেখবো, দাও।
জেবা খাতা এগিয়ে দিযয়ে খাতার দিতে চেয়ে রইলো। আফরা অংক গুলো দেখছে ঠিকই কিন্তু তার মাথায় আর ঢুকছে না কিছুই। কিছুক্ষণ আগের কথোপকথন গুলো শুধু কানে বাজছে। জুঁই জেবার বড় বোন। আপু এখন জব করেন। আপুর বিয়ের জন্য যে অনেক দিন থেকেই পাত্র খুঁজা হচ্ছিল সেটা জানা থাকলেও এমন একটা ঘটনা যে আড়ালে ছিল সেটা অজানা ছিল আফরার। হটাৎ করেই আফরা অনুভব করলো তার মন খারাপ। সে দ্রুত অংক দেখা শেষ করে, কিছু সমস্যা বুঝিয়ে, আগামীকাল এর পড়া দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল।
রাস্তার ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলেছে নানা রকম মানুষ। আফরা আনমনে হেঁটে চলেছে আর চিন্তা করছে জুঁই আপুর কথা। ৩/৪ মাস ধরে জেবাকে পড়াচ্ছে সে, এই কয় মাসে জুঁই আপুর সাথে হাতে গনা ২/৩ বার দেখা হয়েছে। দেখা হলেও কথা হয়েছে মাত্র একবার তাও ৬মিনিট। সামান্য কিছু সময় কথা বলে অফিস যাওযার জন্য বের হয়ে গেছেন আপু। আপুর সব কিছুই ভালো লেগেছে আফরার তবে আপুর চেহরায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট। আপুর মত পবিত্র একটা ফুলের বিয়ে হচ্ছে না এটা ভেবেই যেন মনটা খারাপ করছে ভীষণ। এ মন কি আজ আর ভালো হবে। জেবার একটা ভাইও আছে, তার সাথে কখনো দেখা বা কথা হয় না, পড়াশোনার জন্য বাইরে থাকে। হটাৎ করেই কি মনে হলো, আনমনে বলে উঠল আফরা, 'আল্লাহ তুমি তোমার বান্দাদের হেফাজত করো, তোমার সাহায্য ছাড়া কেউ কোন কিছুই করতে পারে না'।
পড়াশোনা জব বয়স আরো কতশত অযুহাতে একটি মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হয় না সঠিক সময়ে। বাবা মার কাছে মেয়ে সব সময় বাচ্চা থাকে তাই বলে কি মেয়েকে সারা জীবন নিজের কাছে বেধে রাখা চলে! না চলে না। চাইলেও নিজের কাছে রাখা যায় না। চারপাশে চোখ মেলে তাকালেই জুঁই আপুর মত আরোও অনেক মেয়েকে দেখতে পাওয়া যাবে। কাউকে বিয়ে দেওযা হয় নাই পড়াশোনার অযুহাতে, কাউকে বয়সের অযুহাতে, আবার কাউকে জব করানোর অযুহাতে বিয়ে দেওযা হয় নাই। দিন শেষে কি হয়েছে? তাদের বিয়ের মৌসুম চলে গেছে বহু আগে। জুঁই আপুর মত হাজারও জুঁই আপু ঝড়ে পড়ছে দিন শেষে। এই জুঁইফুল গুলো ঝড়ে পড়ার দায় কে নিবে? আদৌ কি কেউ আছে এমন পবিত্র জুঁইফুল ঝড়ে পড়ার দায় নেওয়ার জন্য...!!!

No comments:

Post a Comment

Pages