"বেলাশেষে"
দেখতে দেখতে জীবনের ৬৫ বছর পেরিয়ে গেছে।আমি এখন এক বৃ্দ্ধাশ্রমের এক কোণে এক টুকরো বিছানা কামড়ে পড়ে আছি।জীবনী শক্তি যে নিশ্চল হয়ে আসছে তা প্রতিটি ক্ষণেক্ষণে প্রতিটি ইন্দ্রীয় মনে করিয়ে দিচ্ছে।আমি এখন জীবন মৃত্যুর শেষের সিঁড়িতে অবস্থান করছি।নড়াচড়া করার ক্ষমতা চলে গেছে এখন কেবল আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে আমার কল্পনা আমার স্মৃতি।আমি চোখ বুজে আমার অতীত কে প্রানপনে ডাকতে লাগলাম। স্মৃতিগুলো ও আমার কাছে খুব ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা করে লুকোচুরি খেলতে লাগল আমি আরও প্রাণপনে তাদের সঙ্গ কামনা করলাম।স্মৃতিরা হয়তো করুণা করলো, চোখের সামনে ফুটে উঠলো একটুকরো শৈশব, বাবার হাত ধরে মেলায় যাওয়া সেই ছোট্ট মেয়েটি।এরপর আসল কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে স্কুলে যাওয়া এক চঞ্চল কিশোরী, চরম চঞ্চলতা আর দুরন্তপনায় চোখ দুটো ঝিলিক দিয়ে উঠছে বারবার ।মুহূর্তেই লাল বেনারশি পড়া লজ্জায় রাঙা এক কুমারির মুখ ভেসে আসলো।সে চোখে ছিল একজনকে আপন করে পাবার এক সহস্র ভালোবাসা আর লজ্জার প্রীতি আভাস। তারপরে ভেসে উঠলো পুরোদস্তুর এক গৃহিনীর মুখ, কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে সংসারের তাগাদা দিতে থাকা এক মহিলা।চোখে কালো ফ্রেমের চশমা চুলে পাক ধরা এক নিঃসঙ্গ মহিলার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠলো।নিঃসঙ্গতা যে কি বিভৎস হতে পারে মানুষটিকে হারিয়ে সে বুঝেছিলো।তারপর এই বৃদ্ধাশ্রম এই দম বন্ধ করা এক রুমে বন্দী আজ পাঁচ বছর। আগে মাঝে মাঝে ছেলেরা দেখতে আসত এখন বছরেও তাদের আসা হয়না। কখনো বা যদি আসে সারা রাজ্যির ব্যস্ততা যেন তাদের ঘিরে ধরে।
আজ আমার দিন ফুরিয়ে আসছে, চোখের সামনে একরাশ ঘন অন্ধকারে ক্রমশ পতিত হচ্ছি। অথচ আমি চাচ্ছি আমাকে কেউ এই অন্ধকার থেকে টেনে তুলুক, কড়া রোদ্দুরে এক খোলা মাঠে বুক ভরে নিঃস্বাস নিতে দিক। এই খোলা পৃথিবীর রুপ আর একবার দেখার জন্য আমি চোখ মেলার চেষ্টা করতে লাগলাম কিন্তু সম্ভবত এই চোখ আর এই দুনিয়ার আলো দেখার জন্য নেই।প্রচন্ড তেষ্টায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে আমি ক্ষীণস্বরে পানি পানি বলে পানি চাইতে লাগলাম।গলার স্বর সম্ভবত বাইরে পর্যন্ত গেলোনা গলার কাছেই তাল গোল পাকিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ হতে থাকল।ওপাশ থেকে আমার মানুষ টা বড্ড তাগাদা দিচ্ছে তার নাকি একা একা লাগছে।আমি ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি ছড়িয়ে বললাম আমি আসছি, খুব শীঘ্রই আসছি।আমি ক্রমশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে থাকলাম এই অন্ধকারের কোনো শেষ নেই শুরু নেই।আমি কেবল তলিয়ে যেতে থাকলাম।কি ভয়ংকর এই অন্ধকার! তবে কি এটাই মৃত্যু।

No comments:
Post a Comment