এক সপ্তাহ যাবত তুমুল বেগে আমার বরের সাথে ঝগড়া চলছে।এর আগে এক মাস বাপেরবাড়ি ছিলাম,তাও এই ঝগড়ার কারনেই।এবার অনেকটা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি।ব্যাগপত্র গুছিয়ে সোজা স্টেশন চলে গেলাম।যাবো নাই বা কেনো!ঝগড়া করে কখনও জিততে পারি না।জিতবো কিভাবে একা একা লড়াইয়ে হার জিত থাকে!একা একা কতোক্ষন চিল্লানো যায়!তাই আবার বাপেরবাড়ি চলে যাচ্ছি।এর মধ্যে কয়েকবার ও আমায় পিছু ডেকেছিলো কিন্তু আমি সারা দেই নি।
ট্রেনে উঠে জানালার পাশের সিটে বসলাম।আমার অপর পাশে এক দারুণ জুটি বসে আছে।দারুন বললাম এই জন্য যে তারা দুজনেই বৃদ্ধ কিন্তু তাদের দিকে তাকালেই মনে হবে যেনো সতেজ এক জোরা তরুণ-তরুণী বসে আছে।
বেশ ঠান্ডা পড়েছে আমার রীতিমতো হাত-পা কাপছিলো।ব্যাগ থেকে সালটা বের করতে গিয়ে মনে পড়লো সালটা বাসায় ফেলে এসেছি।হঠাৎ খেয়াল করলাম,দাদু তার নিজের গায়ের সালটা খুলে তার বউকে জড়িয়ে নিলো।তাদের দেখে আমার কেনো জানি মনে হচ্ছিলো সারাজীবনের জন্য ভরসা করার মতো একটা মানুষ সত্যিই দরকার।কিন্তু মনের মিল না থাকলে সারাজীবন যে একসাথে থাকা যায় না তার জলন্ত প্রমান আমার নিজের বর্তমান অবস্থা।
জানালার দিকে একমনে তাকিয়ে অদ্ভুত ভাবনায় হারানোর আগেই ফোন বেজে উঠলো।সাদমানের ফোন দেখেই তারাতারি কেটে দিলাম।একনাগাড়ে ফোন দিয়েই যাচ্ছে।বিরক্ত হয়ে ফোন ধরে বললাম, বারবার ফোন করে বিরক্ত করছো কেনো!
সাদমানকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কাটতেই বৃদ্ধা দাদি বললেন,কি মেয়ে বরের সাথে ঝগড়া করে কোথায় চলে যাচ্ছো!বাপেরবাড়ি!
আমি একটু ইতস্তত হয়ে আলতো করে হাসি দিয়ে জানালার দিকে একমনে তাকিয়ে রইলাম।
বৃদ্ধা দাদি আমার পাশে এসে বসে বললেন,চোখ মুখ শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে বরের সাথে ঝগড়া হয়েছে!
আমি মাথা নাড়ালাম।
বৃদ্ধা দাদি দাদুকে দেখিয়ে বললেন,ওই যে ওনাকে দেখছো ওনার সাথে পঞ্চাশ বছর সংসার করছি।এতো গুলো বছরে হাজারবার ঝগড়া,ভুল বোঝাবুঝি,মতের অমিল,রাগারাগি সবটাই হয়েছে।কিন্তু ওনাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কখনও ভাবতেই পারিনি।
আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,দাদুকে আপনি সহ্য করতেন কি করে!আই মিন এতো ঝগড়াঝাটির পরে কখনও মনে হয় নি আলাদা থাকার কথা!
সে হাসতে হাসতে বললেন,আজকালকার ছেলে ছোকরা তোমরা।তোমাদের বিশ্বাস আজাকাল বড্ড বেশি ঠুনকো।একটু টোকাতেই ভেঙ্গে যায়।আর সব থেকে বড় ব্যাপার কি জানো বাছা আমার ছিলো প্রচন্ড রাগ অল্পেতে ভীষন রেগে যেতাম আমি।যখন আমি রেগে যেতাম তখন তোমার দাদা সাহেব চুপচাপ নিজের কাজে ব্যস্ত থাকতো।ঝগড়া করে মজাই পেতাম না বলে রাগ বেড়ে আরো দ্বিগুণ হয়ে যেতো।এখন বুঝি ঝগড়ার সময় তোমার দাদা সাহেবের চুপ করে থাকার ফলই এই পঞ্চাশ বছর এক সাথে থাকা।আরে বাছা একজন আগুন হলে তো আরেকজনকে পানি হতে হয়।সংসারের নিয়মটাই এমন।
দাদা সাহেবের কথা শুনে আমার চোখে শুধু সাদমানের মুখটা ভেসে উঠছে।সাদমান ও ঠিক এরকম ঝগড়া লাগলেই চুপ হয়ে যায়।
ঠিক পরের স্টেশনে নেমে আবার বাসায় ফিরছি।ট্রেন থেকে নেমে হাঁটছি আর শীতে কাপছি।হঠাৎ পেছন থেকে কে জেনো চাদর জড়িয়ে দিলো গায়ে।পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি সাদমান।হ্যা এই সে,আমার সারাজীবন ভরসা করার একটা মানুষ।
Zannatul Eva
No comments:
Post a Comment